বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ক্ষমা চাইলেন ছয় ব্যাংকের এমডি

জাতীয় বাংলাদেশ সম্পদকীয় সারাদেশ

নির্দেশনা অমান্য করে কর্মী ছাঁটাই

শেখ আবু তালেব: কভিড-১৯ মহামারির সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে কর্মী ছাঁটাই করেছে বেসরকারি খাতের ছয় ব্যাংক। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ভবিষ্যতে এমনটি আর হবে না ও চাকরি হারানোদের বিষয়টি সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমা চেয়েছে ছয় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)।

গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করে ব্যাংকগুলো নিজেদের অবস্থান জানায়। ব্যাংকগুলো হচ্ছে বেসরকারি খাতের ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড (ইবিএল), দ্য সিটি ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংক। একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে এমন তথ্য।

জানা গেছে, কভিড-১৯ মহামারির সময়ে ব্যাংক খাত থেকে কর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও চাকরির নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে নির্দেশনা জারি করা হয়। মানবিক বিষয় হিসেবে ব্যাংকগুলোকে বিবেচনায় নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু করোনা মহামারির মধ্যেই ব্যাংকগুলো তা না মেনে উল্টো কর্মী ছাঁটাই শুরু করে। কয়েকটি ব্যাংক গণছাঁটাই শুরু করে।

কর্মী ছাঁটাইয়ে নেয়া হয় অদ্ভুত কিছু কৌশল। এর মধ্যে রয়েছে মূল্যায়ন পরীক্ষার নামে পেশাগত দক্ষতার বাইরের অভিজ্ঞতা ও মেধা যাচাই। অস্বাভাবিক হারে আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া। যারা আমানত ও ঋণ বিতরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন তাদেরও লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেয়া হয়। এসব লক্ষ্যমাত্রাকে নেয়া হয় মূল্যায়নের তালিকায়। এভাবে নানা-কূটকৌশলে বাদ দেয়া হয় হাজার হাজার কর্মী। শূন্য পদে নতুন করে নেয়া হয় স্বল্প বেতনের কর্মীদের। সেখানেও অবৈধভাবে নিয়োগ বাণিজ্য চলে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি না দিয়েই কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়।

কর্মী ছাঁটাইয়ের অভিযোগের পাহাড় জমা হতে শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংকে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে ছয়টি বেসরকারি ব্যাংকে বিশেষ পরিদর্শন চালায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে দেখা যায়, ছয়টি বেসরকারি ব্যাংক থেকে তিন হাজারের বেশি কর্মী ছাঁটাই করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে অনুযায়ী, ২০২০ সালের এক জানুয়ারি থেকে এ বছরের ৯ আগস্ট পর্যন্ত বেসরকারি ছয় ব্যাংকের তিন হাজার ৩১৩ জন কর্মকর্তা চাকরি ছেড়েছেন। এর মধ্যে ‘স্বেচ্ছায়’ পদত্যাগ করেছেন তিন হাজার ৭০ জন। আর ১২ জনকে ছাঁটাই, ২০১ জনকে অপসারণ ও ৩০ জনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ইস্টার্ন ব্যাংকের ২০১, সিটি ব্যাংকের এক হাজার ৯৮, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ২৭৯, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ১৩৫, ব্র্যাক ব্যাংকের এক হাজার ২১১, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ১৪৬ জন কর্মী ব্যাংক থেকে চলে গিয়েছেন। বিষয়টিকে অস্বাভাবিক মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এমন পরিপ্রেক্ষিতে আরও ব্যাংকের বিরুদ্ধে পরিদর্শন কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে যেমন কঠোর ছিল, এ বিষয়েও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। মানবিক বিষয় হওয়ার পরও ব্যাংকগুলো জোর করে কর্মী ছাঁটাই করেছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এখন বিধি অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে।’

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকারদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় স্বেচ্ছায় তারা চাকরি ছেড়ে চলে গিয়েছেন। কিছু ব্যাংকার নিয়ম মেনেই স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে চলে গিয়েছেন। যাদের পারফরম্যান্স ভালো ছিল না, তারাও চলে গিয়েছেন। আবার কিছু কর্মীকে বরখাস্ত করা হয়েছে। অপরাধের সঙ্গে জড়িত হওয়ার কারণে কিছু কর্মীকে বাদ দিতে হয়েছে।

তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘প্রতিটি ঘটনাকেই বিবেচনায় নেয়া হবে। যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের বা বিভাগীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়া হবে। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ নেই, তাদের বিষয়ে ব্যাংকগুলো যেন সংশোধন করে নেয়। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোকে সময় দেয়া হবে।

জানা গেছে, ব্যাংকগুলো মৌখিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। ভবিষ্যতে কর্মীদের চাকরি ছাঁটাইয়ে যাবে না। যাদের বাদ দেয়া হয়েছে, তাদের প্রায় সবার পাওনা বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক যেন কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়।

এ বিষয়ে জানতে বেসরকারি ইস্টার্ন ব্যাংকের (ইবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ব্যাংকারদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান আলী রেজা ইফতেখারের সঙ্গে একাধিকবার যোগযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। এসএমএস দেয়া হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

একইভাবে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আর এফ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি মোবাইল ফোন কল রিসিভ করে বলেন, ‘রাতে কথা বলা যাবে না।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *